ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে যাচ্ছে সচিবালয়, হবে নতুন সড়ক

রাজধানীর আবদুল গনি রোডের বর্তমান অবস্থান থেকে সচিবালয় সরিয়ে শেরেবাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রাথমিক ব্যয় ধরে নেওয়া এই প্রকল্পে নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি চক্রাকার সড়ক ও নতুন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্থানান্তরের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের পর প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।


গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্থাপত্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিনটি পৃথক নকশা উপস্থাপন করা হয়। সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্ত করার বিষয়ে উপস্থিত ব্যক্তিরা একমত হন।


বৈঠকে উপস্থিত স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, নির্বাচিত নকশার ভিত্তিতেই প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। নকশাগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়ও উপস্থাপন করা হবে। এর আগে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, সরকার দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করে বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়। তবে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং যানজট নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বিবেচনা হয়ে থাকবে।


প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয়ের নতুন ভবনগুলো নির্মাণ করা হবে। প্রস্তাবিত নকশায় প্রতিটি ভবন ১২ তলা করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবনগুলোর নকশা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। নতুন সচিবালয়ে মোট আয়তন বর্তমান স্থাপনার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।


বর্তমানে আবদুল গনি রোডের সচিবালয়ে দাপ্তরিক কাজের জন্য জায়গার সংকট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বর্তমান সচিবালয়ের আয়তন প্রায় ১৭ লাখ বর্গফুট। প্রস্তাবিত নতুন সচিবালয়ের আয়তন হতে পারে প্রায় ৩১ লাখ বর্গফুট। নতুন স্থাপনায় কর্মকর্তাদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।


সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, নতুন সচিবালয়ের চারপাশে চক্রাকার সড়ক নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পেছন দিয়ে আরেকটি সড়ক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের পাশ দিয়ে মিরপুর সড়কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।


তবে প্রস্তাবিত সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে আশপাশের স্থাপনাগুলোর বিষয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। ওই এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের জন্য এসব স্থাপনা সরাতে হবে কি না, তা প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও সমীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।


এ ছাড়া বিজয় সরণি থেকে আগারগাঁও হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যাওয়া সড়কের নিচ দিয়ে একটি পাতাল সড়ক নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ওপরের সড়ক দিয়ে প্রস্তাবিত সচিবালয়ে প্রবেশ করা যাবে এবং নিচের সড়ক ব্যবহার করে মিরপুর সড়কের দিকে যাতায়াত করা সম্ভব হবে। এ জন্য আলাদা প্রকল্প নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।


শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। অতীতে একাধিকবার এ এলাকায় সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এ বিষয়ে কয়েক দফা পরিকল্পনা করা হয়েছিল।


২০১৫ সালে সচিবালয় স্থানান্তরের জন্য ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছিল। তখন ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জিয়া উদ্যানের উত্তর দিকে এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে প্রায় ৩২ একর জমিতে নতুন সচিবালয় নির্মাণের কথা ছিল। ওই এলাকাতেই আগে বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হতো।


সেই পরিকল্পনায় জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশা অনুসরণের কথা বলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চার লাখ মার্কিন ডলার ব্যয়ে লুই আই কানের তৈরি জাতীয় সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলা নগরের মূল নকশা দেশে আনা হয়। ওই নকশায় ১৪ তলা ভিত্তির ওপর নয়তলাবিশিষ্ট চারটি প্রধান ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে আগের উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।


নতুন বিএনপি সরকারের আমলেও সচিবালয়ের ভবন নির্মাণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বর্তমান সচিবালয়ের ভেতরে ২১ তলা ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলে অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থাপত্য অধিদপ্তরকে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাবনা পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।


এরপর গত পাঁচ মাসে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পর্যালোচনা শেষে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। তিনটি নকশার মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পর প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণের জন্য প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।


পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন। ২০২১ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হওয়ার পর মাঠটি বেশির ভাগ সময় খালি পড়ে থাকে। চার বছর আগে সেখানে পার্ক নির্মাণে ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের মতে, জায়গাটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে দখলের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেখানে সচিবালয় নির্মাণ করা হলে জমিটির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


তবে নতুন সচিবালয় নির্মাণের ফলে শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও এলাকায় যানজট বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তাঁর মতে, ১৯৬৯ সালে তৈরি লুই আই কানের নকশার ভিত্তিতে ২০২৬ সালে এসে ওই এলাকায় সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো বিকল্প স্থানে প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন।


ইকবাল হাবিব বলেন, শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ে ইতিমধ্যে বহু সরকারি স্থাপনা গড়ে উঠেছে এবং সেখানে যানবাহনের চাপও বেড়েছে। এর মধ্যে নতুন সচিবালয় নির্মিত হলে যানজটের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সড়কব্যবস্থা, যানবাহনের চাপ, আশপাশের স্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।


সচিবালয় স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বিস্তারিত নকশা, ব্যয় নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং যোগাযোগব্যবস্থার পরিকল্পনার ওপর। নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণ ও এলাকার বিদ্যমান স্থাপনাগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হবে, সেটিও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


ads
ads
ads

Our Facebook Page

↑